ভয়েস অফ গোপালগঞ্জ ডেস্ক,
গোপালগঞ্জে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের এক ব্লক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ না করা, বেশি দাম দাবি করাসহ নানা অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
পানি নিয়ে এমন সংকটে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কুশলী ইউনিয়নের লস্করপাড়ার এই সেচ প্রকল্পের ওই ব্লকে বোরো ধান আবাদ অর্ধেকে নেমেছে বলেও তথ্য উঠে এসেছে।
এসব বিষয়ে ৩২ জন কৃষক সম্প্রতি ব্লক ম্যানেজার আবু বক্কর লস্করের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
আবু বক্কর লস্কর কুশলী ইউনিয়নের লস্করপাড়া গ্রামের বাবু লস্করের ছেলে।
কৃষকরা বলছেন, এই ব্লক থেকে যেখানে বছরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া পায় সরকার, সেখানে ব্লক ম্যানেজার এখন সেচের জন্য কৃষকপ্রতি ৫ হাজার টাকা দাবি করছেন।
টুঙ্গিপাড়া বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কুশলী লস্করপাড়ায় ২ কিউসেক এলএলপি সেচ স্কিম স্থাপন করা হয়। এই সেচ স্কিমের আওতায় ১২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করেন ওই গ্রামের ৬০ জন কৃষক।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী মটর, ট্রান্সফরমার, পাম্প হাউস, বারিড পাইপলাইন ভাড়া বাবদ বার্ষিক মোট ৫ হাজার টাকা বিএডিসিতে জমা দেন ম্যানেজার আবু বক্কর লস্কর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে কুশলী ইউনিয়নের ওই ব্লকের ১২ হেক্টর জমিতে অন্তত ১০০ টন হাইব্রিড ধান উৎপাদন হওয়ার কথা। কিন্তু উৎপাদিত হচ্ছে ৫০ থেকে ৬৫ টন।
কৃষকদের অভিযোগ পর্যাপ্ত পানির অভাবেই উৎপাদনে এমন ধস নেমেছে।
কুশলী ইউনিয়নের লস্করপাড়া গ্রামের কৃষক মুজাহিদ লস্কর বলেন, “ম্যানেজার আবু বক্কর লস্কর চাহিদার অর্ধেক পানি সরবরাহ করেন। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাঁর জমিতে পানি দেওয়া বন্ধ করে দেন।
এতে এ ব্লকে ফসলের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এ ছাড়া এত বছর ধরে ব্লক ম্যানেজার আবু বক্করকে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দিতাম। এ বছর বিএডিসির দোহাই দিয়ে সেচ পানির দাম ৫ হাজার টাকা করে চেয়েছেন। টাকা না দিতে পারলে জমিতে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “সরকারি সেচ ব্যবস্থায় পানির দাম দ্বিগুণ করার কোনো বিধান নেই। কারণ এক্ষেত্রে সরকার বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়। ব্লকের পাম্প, ট্রান্সফরমার ও বারিড পাইপ সরকার মেরামত করে দেয়। আমাদের চাষাবাদ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে এ ব্লক ম্যানেজার অন্যায্য টাকা দাবি করছেন।”
লস্করপাড়া ব্লকের কৃষক সোহেল লস্কর ও জামাল ফরাজী বলেন, ম্যানেজার আবু বক্করের গাফিলতির কারণে তারা ঠিকমতো জমিতে পানি দিতে পারেন না। তাই প্রতিবছর তাদের ধানের ফলন কমে যাচ্ছে। আগে বিঘাপ্রতি ৪০/৪৫ মণ হাইব্রিড ধান পেতেন, এখন উৎপাদন হয় ২২ থেকে ২৫ মণ।
তারা বলেন, ম্যানেজারের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার বিএডিসির অফিসারদের কাছে মৌখিক অভিযোগ করেছি। তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। কৃষির স্বার্থে আমরা এই ব্লক ম্যানেজারের অপসারণ চাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, ব্লক ম্যানেজার আবু বক্কর লস্কর ও এলাকার কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি এ টাকার ভাগ পান। এর সঙ্গে বিএডিসির কর্মকর্তাদের যোগসাজশও থাকতে পারে। না হলে ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের আপত্তি কোথায়!
লস্করপাড়া ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের এই ব্লক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে শুধু কৃষকরাই নন, অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় সেচ পরিচালনা কমিটিরও।
সেচ প্রকল্পের সভাপতি আফজাল লস্কর বলেন, এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমিটি রয়েছে। ব্লক ম্যানেজার কমিটিকে কোনো কিছু না জানিয়ে নিজের মতো করে ১২ বছর ধরে সেচ কাজ পরিচালনা করে আসছেন।
তিনি আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব দেন না। কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা সব টাকা তিনি পকেটে ভরেন।”
সভাপতি আরও অভিযোগ করেন, “বছরে চার মাস সেচ কাজ চলে। তিনি এ কাজের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা পারিশ্রমিক হিসেবে নিতে পারেন। বাদবাকি টাকা সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু ১২ বছরেও ব্যাংক হিসাবই খোলা হয়নি। ফলে কোনো টাকাও জমা দেওয়া হয়নি।”
তবে ব্লক ম্যানেজার আবু বক্কর লস্কর বলেন, “বোরো মৌসুমে পৌষ থেকে চৈত্র পর্যন্ত চার মাস ব্লক চলে। প্রতি বছর ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। ব্লকের ট্রান্সফরমার, বারিড পাইপ, পাম্প বা অন্যান্য উপকরণ মেরামতে কোনো টাকা বিএডিসি দেয় না। এটি আমাকে মেরামত করে নিতে হয়। এছাড়া পাম্প চালাতে শ্রম ও সময় দিতে হয়।”
যারা অভিযোগ করেছেন লস্করপাড়া ব্লকে তাদের জমি নেই দাবি করে তিনি আরও বলেন, “কৃষকরা ঠিকমতো টাকা দেন না। এ ব্লক চালিয়ে আমার লাভের টাকা থাকে না। গত ১২ বছরে সব কিছুর দাম বেড়েছে। সে কারণে এ বছর সেচের পানির দাম বাড়িয়ে দিতে বলেছি।”
কৃষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, “প্রতিবার পাম্প চালাতে ব্যাপক পরিশ্রম ও পানির প্রয়োজন হয়। এ কারণে কখনও কখনও সময়মতো পাম্প চালাতে পারিনি। ”
টুঙ্গিপাড়া বিএডিসি ক্ষুদ্রসেচ প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সেচ কাজ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিকে ব্লক ম্যানেজার করা হয়। এ ক্ষেত্রে উপজেলা সেচ কমিটি যাকে সুপারিশ করে তাকে ওই পদ দেওয়া হয়। এ জন্য তাকে সরকারিভাবে কোনো বেতন দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, “ব্লকের পাম্প, ট্রান্সফরমার, বারিড পাইপে সমস্যা হলে আমরা সরকারি খরচে মেরামত করে দেই। চুরি হলে এর দায়-দায়িত্ব ব্লক ম্যানেজারকে বহন করতে হবে। আমরা সেচ পানির দাম বাড়াতে বলিনি। পানির দাম বাড়ানো কমানোয় আমাদের হাত নেই। এমনকি ম্যানেজারের সঙ্গেও আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”
“এছাড়া সেচ পরিচালনার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। তারা সেচের পানির দাম নির্ধারণ ও আদায়ের কাজ করে থাকেন। আদায় করা কিছু টাকা দিয়ে সেচ বাবদ খরচ বহন করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “লস্করপাড়া ব্লকের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে কৃষকদের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্তব্য করুন