ভয়েস অফ গোপালগঞ্জ ডেস্ক,
কয়েক দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দিয়ে গোপালগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনেই প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আওয়ামী লীগের ‘দুর্ভেদ্য ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এই জেলায় ধানের শীষের এমন জয়কে ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে জেলা প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জেলার সব কটি আসনে জয় পেল বিএনপি।
গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী একাংশ)
এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদুপুর বিভাগ) মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৭১ হাজার ৫৭৯ ভোট।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া ট্রাক প্রতীকে পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৬৪ ভোট। তিনি কারাবন্দি থেকেই নির্বাচনে অংশ নেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে কাবির মিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের মুহাম্মদ ফারুক খানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনে টানা ৬ বার সংসদ সদস্য ছিলেন মুহাম্মদ ফারুক খান।
গোপালগঞ্জ-২ (সদর ও কাশিয়ানী একাংশ)
এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির তৃণমূল থেকে উঠে আসা ডা. কে এম বাবর আলী। পেশায় চিকিৎসক বাবর আলী গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান জেলা আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য। ধানের শীষ প্রতীকে তার প্রাপ্ত ভোট ৪০ হাজার ৪৮।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু হরিণ প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জু গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেছেন। এই আসনে ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বার সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া)
ইতিহাস গড়ে এই আসনে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী। টুঙ্গিপাড়ার সন্তান জিলানী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৬০ হাজার ১৬৬ ভোট।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮৬৭ ভোট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমির এই আসনে ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বার নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪) অনুষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই এই জেলাটি ছিল আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনেই নৌকার প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে অন্য কোনো প্রার্থীর জামানত রক্ষা করাই ছিল একসময় অসম্ভব। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৬-এর এই নির্বাচনে গোপালগঞ্জের ভোটাররা প্রথমবারের মতো ব্যালটের মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীদের বেছে নিলেন।
এবারের নির্বাচনে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে মোট ভোটার ছিলেন ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জন। জেলার ৩৯৭টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
মন্তব্য করুন